কড়া নাড়ছে চারুকলার মহাযজ্ঞ

পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিচিত্র সব শিল্পকর্ম এখন ঢাকায়। সেগুনবাগিচার জাতীয় চিত্রশালার দেয়াল, মেঝেতে শোভা ছড়াচ্ছে। চিত্রশালার করিডরে, ভবনের বাইরের করিডরের নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিদগ্ধ শিল্পীর অভিজ্ঞতার ফসল। দুটো দিন গেলেই সবার জন্য খুলে দেওয়া হবে চিত্রশালার দরজা। আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জর্জিয়া, জার্মানি, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, পোল্যান্ড, সার্বিয়ার মতো দেশের শিল্পকর্ম দেখার বিরল সুযোগ পাবেন বাংলাদেশের শিল্পপ্রেমীরা।

আগামী ১ সেপ্টেম্বর শুরু হচ্ছে ১৮তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী। শনিবার বেলা তিনটায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। উদ্বোধনীতে সম্মানিত অতিথি থাকবেন জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক তেতসুইয়া নোদা। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ আয়োজনের পুরস্কার ঘোষণা করবেন বিচারকমণ্ডলীর প্রধান শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। উদ্বোধন এবং পুরস্কার বিতরণ শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা। মাসব্যাপী প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সব শ্রেণির দর্শকের জন্য খোলা থাকবে এ প্রদর্শনী। ১৯৮১ সালে ১৪টি দেশের অংশগ্রহণে শুরু হয়েছিল এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল। এ বছর এ আয়োজন ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকায়। এবার ৬৮টি দেশ এ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে, যা এযাবৎকালের রেকর্ড।

চিত্রশালা প্লাজা থেকে শুরু করে সবগুলো প্রদর্শনী ঘুরে আয়োজনের প্রস্তুতি দেখা গেল। ছবি: প্রথম আলোচিত্রশালা প্লাজা থেকে শুরু করে সবগুলো প্রদর্শনী ঘুরে আয়োজনের প্রস্তুতি দেখা গেল। ছবি: প্রথম আলো গতকাল বৃহস্পতিবার শিল্পকলা একাডেমিতে চোখে পড়ে প্রদর্শনী আয়োজনের কর্মযজ্ঞ। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বিরামহীন চলছে কাজ। দূর থেকেও ঠুক ঠুক শব্দ শোনা যায়। চলছিল দেয়ালে ছবি টাঙানো, স্থাপনাশিল্প সাজানো, কারুকাজ, ভবনের ভেতর ও বাইরে রং করার কাজ।

দুপুরে দেখা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক ফরিদা জামান, শিল্পী মোহাম্মদ ইকবালের সঙ্গে। তাঁর দুজনই ছবি ডিসপ্লে কমিটিতে আছেন। কথা প্রসঙ্গে এ দুই শিল্পী বলেন, এবারের আয়োজনে দেশি শিল্পীদের বেশ ভালো কিছু কাজ এসেছে। বাইরের শিল্পীদের কিছু ব্যতিক্রম কাজ আছে, যা দর্শকদের আনন্দ দেবে।

জাতীয় চিত্রশালা গ্যালারির ভেতরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ছবি মাসুম আলীজাতীয় চিত্রশালা গ্যালারির ভেতরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ছবি মাসুম আলী বলা হচ্ছে, এশিয়ার সবচেয়ে বড় চারুকলা প্রদর্শনী এটি। সত্যি কি তাই? জানতে চাইলে জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব দ্য ফাইন আর্টস থেকে তৈলচিত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া শিল্পী মোহাম্মদ ইকবাল জানালেন, এশিয়া অঞ্চলে যে কয়টা দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীর আয়োজন শুরু হয়েছিল, তার মধ্যে একমাত্র টিকে আছে আমাদের এটি। সময়ের বিবেচনায় এটি সবচেয়ে প্রাচীন এবং পরিসরে বড়।

শিল্পী মাহবুবুর রহমানকেও দেখা গেল আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। তিনি জানালেন, এবারের আয়োজনের বিশেষ সংযোজন পারফরম্যান্স আর্ট প্রেজেন্টেশন। এতে দেশের ১৬ শিল্পীর সঙ্গে অংশ নেবেন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ দশ দেশের ১৪ জন শিল্পী। থাকছে পারফরম্যান্স আর্টের ওপর কর্মশালাও।

জাতীয় চিত্রশালার বাইরে সাজছে ভাস্কর্য পার্ক। ছবি মাসুম আলীজাতীয় চিত্রশালার বাইরে সাজছে ভাস্কর্য পার্ক। ছবি মাসুম আলী কথা হলো শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সঙ্গে। তিনি জানান, প্রায় ৬ কোটি টাকা বাজেটে এবারের এই আয়োজন। দুই বছর অন্তর অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে গেল ১৭ বারের তুলনায় এবার অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি শিল্পকর্মের সংখ্যাও বেশি। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি কিউরেটরদের দিয়ে এবারের প্রদর্শনী সাজানো হচ্ছে। প্রদর্শনীতে এবার দেখা যাবে ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম, থাকছে নানা মাধ্যমের চিত্রকলা, ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, আলোকচিত্র, স্থাপনাশিল্প, পারফরম্যান্স আর্ট, নিউ মিডিয়ার শিল্পকর্ম। লাকী বলেন, আমাদের চারুশিল্পের সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম ‘দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী বাংলাদেশ’। সাঁইত্রিশ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রদর্শনী আয়োজিত হয়ে আসছে। এ প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে যেমন শিল্পী প্রতিনিধিরা আসেন, তেমনি সারা দেশ থেকে শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করে থাকেন।

জানা গেছে, এবারের আয়োজনে ২৬৬ জন বিদেশি শিল্পীর মধ্যে ২২৩ জন শিল্পী প্রতিযোগিতায় শিল্পকর্ম জমা দিয়েছেন। ২৯ জন বিদেশি শিল্পী বিশেষ আমন্ত্রণে অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া ১৯৯ জন বাংলাদেশি শিল্পীর মধ্যে ১০৭ জন শিল্পী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। এবার বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের চিত্রকলাকে পরিচয় করিয়ে দিতে থাকছে বরেণ্য শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। একাডেমির আর্কাইভ থেকে গ্যালারির আলোয় এসে শোভা বাড়াবে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, পটুয়া কামরুল হাসান, শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক, মোহাম্মদ কিবরিয়াসহ বেশ কয়েকজন প্রয়াত বরেণ্য শিল্পীর কাজ। পাশাপাশি আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশ নেওয়া ভারতের চিত্রকর যোগেন চৌধুরী, মানু পারেখ ও মাধবী পারেখ, নেপালের রাগিণী উপাধ্যায় এবং ফ্রান্সের বার্নার্ড ফ্রাঙ্কোয়েস লিঁও ক্লারিসর শিল্পকর্ম দর্শকের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকবে। মিলবে বাংলাদেশের বরেণ্য শিল্পী হাশেম খান, রফিকুন নবী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আফজাল হোসেন, শামসুদ্দোহা প্রমুখের কাজও।

বেশির ভাগ শিল্পকর্ম সাজানোর কাজ শেষ। ছবি: প্রথম আলোবেশির ভাগ শিল্পকর্ম সাজানোর কাজ শেষ। ছবি: প্রথম আলোদেশি-বিদেশি শিল্পীদের মোট ৩৬৮টি পেইন্টিং, প্রিন্ট ও ফটোগ্রাফি, ৩৩টি ভাস্কর্য, ৫২টি ইনস্টলেশন আর্ট এবং ৩০ জন পারফরম্যান্স আর্টিস্টের শিল্পনৈপুণ্য প্রদর্শনী। আয়োজনের মধ্যে আরও থাকছে ১২ জন বাংলাদেশি নবীন শিল্পীর অংশগ্রহণে এবং শিল্পী বিশ্বজিৎ গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে ‘ইয়াং আর্ট প্রজেক্ট’।

বিশাল শিল্পযজ্ঞে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আন্তর্জাতিক সেমিনার, পেইন্টিং, ভাস্কর্য, আলোকচিত্র, প্রাচ্যকলা, প্রিন্ট মেকিং, ভিডিও আর্ট, মৃৎশিল্প, পারফরম্যান্স আর্ট, নিউ মিডিয়া এবং স্থাপনা শিল্প।

দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর এবারের আসরে সেমিনারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে আয়োজকেরা। ২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে সমসাময়িক চিত্রকর্মের ভাষা নিয়ে এবং ৩ সেপ্টেম্বর চিত্রকলার শিক্ষা ও প্রসার নিয়ে সেমিনার। থাকবে আরও বেশ কিছু ছোট-বড় সেমিনারের আয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। ছবি: প্রথম আলোসংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। ছবি: প্রথম আলো১৮তম দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী সামনে রেখে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সংস্কৃতি সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগ এ আয়োজনকে ধারাবাহিকভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে এসেছে। চারুশিল্পীদের মতবিনিময়ের অনন্য পটভূমি হিসেবে “দ্বি-বার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী বাংলাদেশ” আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও শিল্প-সমঝদারদের বন্ধুত্বের এক অনুপম সেতুবন্ধরূপে গড়ে উঠেছে। নানা দেশ ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে উঠে আসা শিল্পী ও শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাবের এই আদান-প্রদানের সুফল আমরা দেখতে পাচ্ছি শিল্পকলা-সংক্রান্ত নানা গবেষণায় এবং তাঁদের বৈচিত্র্যময় সৃজন সমাহারে।’

সূত্রঃ প্রথম আলো